দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক জড়তা কাটানোর প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ হলো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানীতে বসছে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। জোটভুক্ত ১১টি দেশের এই আয়োজনে ঐতিহ্য অনুযায়ী আয়োজক দেশ বাইরের কিছু রাষ্ট্রকে বিশেষ অতিথি হিসেবে ডাকার সুযোগ পায়, আর এবার সেই তালিকায় জায়গা পেয়েছে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, আমন্ত্রণটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পৌঁছেছে এবং তা ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই মূলত এই প্রশ্নের অবতারণা হয়েছিল।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঠিক এমন এক সময়ে এই আমন্ত্রণ এলো, যখন ঢাকা ও দিল্লি উভয়ই সম্পর্কের টানাপড়েন কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার চেষ্টা চালাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্কে ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় আসার পর, যখন উভয় পক্ষ থেকেই সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়।
নতুন সরকার গঠনের পরপরই দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন খোদ মোদী নিজেই—সে সময় ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ব্যক্তিগতভাবে তারেক রহমানের হাতে সেই আমন্ত্রণপত্র তুলে দেন। তবে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ হিসেবে সরকারপ্রধান হিসেবে নিজের প্রথম বিদেশ সফরে ভারত বা চীন নয়, বরং মালয়েশিয়াকে বেছে নেন তারেক রহমান। যদিও একই সফরসূচিতে বেইজিং ভ্রমণও রাখা হয়েছিল। জুন মাসে সেই সফর শেষে দেশে ফেরার পরপরই সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে গুঞ্জন ছড়াতে শুরু করে।
এর মধ্যেই চলতি জুলাইয়ে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিমসটেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামছুল ইসলাম। পাশাপাশি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের অংশ হিসেবে অভিজ্ঞ রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকা মিশনের প্রধান হিসেবে পাঠিয়েছে দিল্লি, আর ভারতে বাংলাদেশ মিশনের নেতৃত্বেও শিগগির পরিবর্তন আসতে পারে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, দুই রাজধানীর মধ্যকার দূরত্ব ঘোচাতে দীনেশ ত্রিবেদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে গত ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম নতুন করে চালু করেছে ভারত। সব মিলিয়ে ব্রিকস সম্মেলনের এই আমন্ত্রণকে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
