বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ইতিহাসে “কানসাট বিদ্রোহ” একটি অনন্য অধ্যায়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের মতো একটি মৌলিক দাবি নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন একসময় রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে, যেখানে প্রাণ হারান বেশ কয়েকজন সাধারণ গ্রামবাসী। প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কানসাটের নাম আজও বাংলাদেশের জনআন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হয়।
কোথায় ঘটেছিল এই আন্দোলন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার একটি জনপদ কানসাট। মূলত এই এলাকা থেকেই শুরু হয়েছিল বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত অধিকার আদায়ের এই আন্দোলন, যা পরবর্তীতে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে।
আন্দোলনের সূত্রপাত
২০০৫-২০০৬ সালে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল নিত্যদিনের চিত্র। এর পাশাপাশি কৃষকদের বিভিন্ন অজুহাতে জরিমানা করা, অতিরিক্ত মিটার ভাড়া আদায় এবং চুরি যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত ট্রান্সফরমারের জন্য গ্রাহকদের ওপর জরিমানা চাপিয়ে দেওয়ার মতো নানা হয়রানিতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন কানসাটের কৃষক ও সাধারণ মানুষ।
এই ক্ষোভের পটভূমিতে “পল্লীবিদ্যুৎ উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদ”-এর ব্যানারে সংগঠিত হতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে উঠে আসেন গোলাম রব্বানী নামের একজন স্থানীয় ব্যক্তি, যিনি পরবর্তীতে এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সারাদেশে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
পাঁচ দফা দাবি
২০০৫ সালে আন্দোলনকারীরা মূলত পাঁচ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামেন:
- নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা
- মিটার ভাড়া ও ন্যূনতম চার্জ প্রত্যাহার করা
- চুরি যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত ট্রান্সফরমারের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় বন্ধ করা
- অহেতুক হয়রানি ও দুর্নীতি বন্ধ করা
- বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
দাবি মানা না হলে ২০০৬ সালের ৪ জানুয়ারি আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এই কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের সঙ্গে কৃষক-জনতার সংঘর্ষ বাধে, আর এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায় বিক্ষোভকারীদের ওপর। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষ।
জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ধীরে ধীরে বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, পুরো আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে মোট প্রায় বিশ জন নিরীহ গ্রামবাসী নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। ক্ষুব্ধ জনতা এক পর্যায়ে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়, যা আন্দোলনের তীব্রতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব
কানসাটের এই আন্দোলন শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি দ্রুত জাতীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সে সময়কার সরকারের ওপর এই আন্দোলন যথেষ্ট চাপ তৈরি করেছিল, আর এটি প্রমাণ করেছিল যে বিদ্যুতের মতো মৌলিক নাগরিক সেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কতটা তীব্র রূপ নিতে পারে।
জানুয়ারি মাসে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এপ্রিল মাসে একটি সমাপ্তিতে পৌঁছায়, যাকে আন্দোলনকারীদের আংশিক সাফল্য হিসেবেই দেখা হয়।
আন্দোলন-পরবর্তী অধ্যায়
আন্দোলনের নেতা গোলাম রব্বানী তার এই ভূমিকার জন্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস পায় এবং তিনি ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির মূলধারা থেকে দূরে সরে যান।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক কানসাট
দুই দশক পেরিয়ে এলেও কানসাট আন্দোলন বাংলাদেশে জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছিল, নাগরিক সেবা-সংক্রান্ত অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকলে তা কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষ ও সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা করে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা আজও কানসাটের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন—কষ্টের মধ্যেও যে লড়াই তাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছিল।
কানসাট বিদ্রোহ তাই কেবল একটি স্থানীয় আন্দোলনের ইতিহাস নয়—এটি বাংলাদেশের জনগণের অধিকার সচেতনতা ও প্রতিবাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও একটি অংশ, যা ভবিষ্যতের যেকোনো নাগরিক আন্দোলনের জন্য একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
